পিতা-পুত্রের একসঙ্গে ইভটিজিংঃ ছাত্রীদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ধরে টানাহেঁচড়া!

কুদ্দুস মিয়ার বয়স পঞ্চাশ। তার ছেলে শফিকুল ইসলামের বয়স ২২ বছর। বাপ-বেটা ছাড়াও ঘটনার সঙ্গী সাথী হিসেবে কুদ্দুসের শ্যালক আরজ মিয়া (২৫), গ্রামের লায়েছ মিয়া (২২) ও দানিছ মিয়ার (২২) নাম রয়েছে। স্কুলে যাওয়ার পথে ৪ ছাত্রীর পথরোধ করে এরা। ছাত্রীদের হাত ধরে বলে- ‘তোদের অভিভাবকগণ আমাদের বিরুদ্ধে নালিশ করিয়াছে, তোরা জানস না আমরা তোদের ছাড়া বাচিব না, তোরা আমাদের জানের জান প্রাণের প্রাণ’। এই কথা বলে আসামিরা তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ধরে টানাহেঁচড়া করে।

এ সময় ছাত্রীরা চিৎকার করে নিজের ইজ্জত রক্ষায় দৌড় দেয়। ছাত্রীদের হুমকি দিয়ে তারা আরো বলে বিবাহ বা অবৈধ মেলামেশায় রাজি না হলে এসিড দিয়ে মুখ ঝলসে দেয়া হবে। এই অভিযোগ তুলে ধরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দেয়া হয় ওই ৫ জনের বিরুদ্ধে। ১৫ই নভেম্বর নাসিরনগর থানায় এই মামলা রেকর্ড হওয়ার আগেই কুদ্দুস মিয়াকে আটক করে চাতলপাড় তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুসারে কুদ্দুস মিয়ার বয়স ৫০ বছর হলেও মামলায় তার বয়স ১০ বছর কম দেখানো হয়।

চাতলপাড় ওয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী মোছাম্মৎ তাসলিমা আক্তার (১৪) ও ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী মোছাম্মৎ আছমা বেগমের (১২) বড় ভাই পতইর গ্রামের আলমগীর হোসেন এই মামলার বাদী। তার দু-বোনসহ একই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী মোসাম্মৎ সুগেরা খাতুন (১৪) এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস (১২) ঘটনার শিকার বলে মামলার এজাহারে বলা হয়।

তারা ৪ জন বিদ্যালয়ে আসা যাওয়ার পথে বিভিন্ন সময় আসামিরা খারাপ অঙ্গভঙ্গি করে ও শিস দেয়। ২৬শে অক্টোবর ও ১৪ই নভেম্বর একই ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ করা হয়। অভিযোগ কোনো তদন্ত ছাড়াই মামলাটি রেকর্ড করে নাসিরনগর থানা। এমন মামলার খবরে তাজ্জব এলাকার মানুষ। সরজমিনে সেখানে গিয়ে জানা যায় এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি গ্রামে। স্কুল থেকেও বিষয়টির তদন্ত করা হয়েছে। কিন্তু সত্যতা মিলেনি।

জানা গেছে, হাজেরা নামে গ্রামের পশ্চিমপাড়ার এক মহিলার সঙ্গে ঝগড়া হয় দক্ষিণপাড়ার স্কুলছাত্রী তাসলিমার। এর জের ধরে পরদিন তাসলিমা স্কুলে যাওয়ার পথে হাজেরা তার ওপর চড়াও হয়। ওয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরিচালনা কমিটির ৪ সদস্য ঘটনার একটি তদন্ত করেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির নির্দেশে। তারা সরেজমিন এবং গোপনে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হন ঘটনার ব্যাপারে।

ওয়াজ উদ্দিন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. তবারক ভূঁইয়া বলেন- ইভটিজিং বলতে কোনো কিছু না। পরীক্ষা (জেএসসি) চলাকালীন সময়ে ঘটনাটি ঘটলে মেয়ের পক্ষ থেকে আমাদেরকে ফোন করা হয়। আমি ওইদিন ছিলাম এলাকার বাইরে। হেডমাস্টার সাহেবকে বিষয়টি জানালে তিনি তাৎক্ষণিক পুলিশ নিয়ে সেখানে গিয়ে মেয়েটিকে স্কুলে নিয়ে আসেন। এরপর প্রকৃত ঘটনা খুঁজে বের করতে আমরা তদন্ত কমিটি করে দিই।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আয়ুব খান, সহকারী শিক্ষক মোশাররফ হোসেন এবং পরিচালনা কমিটির দুই সদস্য বায়তুল আলম ভূঁইয়া ও এনামুল হক তদন্ত করে আমাকে জানান ঘটনার সঙ্গে কোনো পুরুষ লোকের সংশ্লিষ্টতা তারা পাননি।

প্রধান শিক্ষক মো. আয়ুব খান বলেন- ছাত্রীটি কেদে আমাকে ফোন দেয়। তারে মারপিট করেছে এবং তার এডমিট কার্ড নিয়ে যেতে চাইছিল বলে আমাকে জানায়। এরপর মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত সেখানে যাই। পাশাপাশি পুলিশকেও খবর দেয়। গিয়ে দেখি ছাত্রীর স্কুল ড্রেসের ওপর কাদা লেগে রয়েছে। আমি তাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে আসি। ওই সময় জানতে পারি হাজেরা নামের এক মহিলা তাকে মারধর করেছে।

বায়তুল আলম ভূঁইয়া বলেন- এ ঘটনায় পুরুষের কোনো সংশ্লিষ্টতা আমরা পাইনি। তারা যে ৩ ছেলের নাম বলেছে এর মধ্যে দানিছ আর লায়েছ ওইদিন এলাকাতেই ছিল না। এনামুল হক বলেন- আমরা সেখানে যাওয়ার পর দু-পক্ষই গ্রামের জামাল মিয়া (৭০) ও মস্তু মিয়া (৫০)কে সাক্ষী হিসেবে হাজির করে আমাদের কাছে।

আমরা এ দু-জনের কাছে জানতে চাইলে তারা আমাদেরকে বলেন- ঘটনার সঙ্গে পুরুষ কোনো লোক জড়িত নয়। তাছাড়া ছাত্রীর মামি এসেও সাক্ষী দেয় ঘটনার সঙ্গে হাজেরাই জড়িত বলে। স্কুলশিক্ষক মোশাররফ হোসেন বলেন- ঘটনার পর আমরা সেখানে গিয়ে কারো কাছ থেকেই আরজ মিয়ার নাম শুনিনি। এখন শুনছি সেও মামলার আসামি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাসিরনগর থানার অফিসার ইনচার্জ আবু জাফর বলেন আমরা বিষয়টি ভালোভাবে তদন্ত করে দেখবো। চাতলপাড় তদন্ত কেন্দ্রের ইন্সপেক্টর কাজী মো. মাহফুজ হাসান সিদ্দিকীর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজন জানান- পতইর গ্রামের কুতুব উদ্দিন ও রুবেল মেম্বারের লোকজনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। রুবেল মেম্বারের পক্ষ কুতুব মিয়ার পক্ষের লোকজনের বিরুদ্ধে নানা ঘটনায় এ পর্যন্ত ৮/১০টি মামলা দিয়েছে।-মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *